
নিত্যনতুন প্রযুক্তির ছোঁয়া প্রতিনিয়ত আমাদের ভবিষ্যৎ বদলে দিচ্ছে। এই পরিবর্তন একমুখী নয়, বরং বহুমাত্রিক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড স্টোরেজ, বিগ ডেটা ও অ্যাডভান্স অ্যানালাইটিকস, ৫জি ও নেক্সট-জেন কানেক্টিভিটি, এজ কম্পিউটিং, ব্লকচেইন ও সাইবার সিকিউরিটির মতো প্রযুক্তিগুলো বর্তমানে আইটি খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বিশ্বব্যাপী ব্যবসা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, উৎপাদনসহ প্রায় সব খাতেই প্রযুক্তির প্রভাব গভীরতর হচ্ছে। তাই সময়ের চাহিদা অনুযায়ী উপযুক্ত সল্যুশন্স উদ্ভাবন এবং একটি পরিবেশবান্ধব টেক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা আজ অপরিহার্য।
বিশ্ববিখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান গার্টনার এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী আইটি খাতে ব্যয় ৫.৭৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এর পেছনে বড় কারণ হলো ডিজিটাল রূপান্তর, ক্লাউড-ফার্স্ট স্ট্র্যাটেজি এবং ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলোতে আইটি সেবার চাহিদা বৃদ্ধি। বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম এখন অনেক বেশি সক্রিয় ও বিস্তৃত। আইটি খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বর্তমানে প্রায় ২০-২৫ শতাংশ, যা আরও বাড়ার বিশাল সুযোগ রয়েছে।
তবে এই সম্ভাবনা সত্ত্বেও, আমাদের দেশের আইটি খাতে এখনো পুরোপুরি নজর দেওয়া হয়নি। বিনিয়োগ, নীতি ও কৌশলগত দিক বিবেচনায় আমাদের আরো জোরাল পদক্ষেপ নেবার সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম গুরুত্ব দিতে হবে সচেতনতা বৃদ্ধি বৃদ্ধি ও দক্ষ মানব-সম্পদ তৈরির ওপর। এখনো অনেক প্রতিষ্ঠান আইটি সেবাকে অতিরিক্ত খরচ হিসেবে দেখে, বিনিয়োগ হিসেবে নয়। অথচ বিভিন্ন গবেষণা বলছে, উপযুক্ত আইটি সল্যুশন ও প্রোডাক্ট ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যবসায় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব।
বর্তমানে সরকারি দপ্তর, ব্যাংক, স্বাস্থ্যখাত, কৃষি ও শিল্পকারখানায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। এমনকি ছোট ও মাঝারি ব্যবসা-এসএমই এবং উদ্যোক্তারাও সার্ভার, স্টোরেজ, নেটওয়ার্ক এবং সাইবার সিকিউরিটির মতো বিশেষায়িত আইটি সেবা গ্রহণ করছে। এখানেই উঠে আসে থার্ড-পার্টি মেইনটেন্যান্স (টিপিএম) এর প্রয়োজনীয়তা। যেখানে পুরোনো হার্ডওয়্যার ব্যবস্থাপনায় এ আইটি সার্ভিসের খরচ কমিয়ে এবং হার্ডওয়্যারের লাইফটাইম বৃদ্ধি করেও খরচ কমিয়ে আনা যায়।
আইটি খাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে- ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও। ইউএন গ্লোবাল ই-ওয়েস্ট মনিটর ২০২২ অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বে ৬২ মিলিয়ন টনের বেশি ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার মধ্যে মাত্র ২৩ শতাংশের কম রিসাইকেল হয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩ মিলিয়ন টনের বেশি ই-বর্জ্য জমা হয়, যার বেশিরভাগই আসে বাতিল হওয়া আইটি হার্ডওয়্যার থেকে। অথচ টিপিএম এবং রিসাইকেল উপযোগী ডিজাইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই বর্জ্য অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। এটিকে উপেক্ষা করলে পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্যগত সংকট দেখা দিতে পারে।
এছাড়া, নিরাপত্তা এখন একটি অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। ডিজিটাল রূপান্তর যত বাড়ছে, সাইবার হুমকি তত বেশি জটিল হচ্ছে। ফলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের তথ্য, নেটওয়ার্ক ও গ্রাহক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে উপযুক্ত টেক সহায়তা প্রয়োজন। যেখানে- সাইবার সিকিউরিটির পাশাপাশি জিরো ট্রাস্ট আর্কিটেকচার এবং ক্লাউড সিকিউরিটির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
তথ্যপ্রযুক্তির অপার সম্ভাবনার দোরগোড়ায় আমাদের প্রয়োজন সরকারি পর্যায়ে যুগোপযোগী নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি পর্যায়ে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি। একমাত্র একটি সমন্বিত টেক ইকোসিস্টেম এর মাধ্যমেই আমরা দেশীয় ও বৈশ্বিক চাহিদা পূরণে সক্ষম হবো এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি টেকসই, দক্ষ ও পরিবেশবান্ধব আইটি খাত গড়ে তুলতে পারবো।
লেখক: নাসির ফিরোজ, সিইও, সার্ভিসিং২৪